|

বেদের সময় কাল

বেদের সময় কাল : বৈদিক সাহিত্যের সময়কাল নির্ণয়ে নানা মুনির নানা মত প্রচলিত। আলোচ্য পোস্টে সংক্ষিপ্ত আলোচনা উপস্থাপিত হলো।

বেদের সময় কাল


ভারতীয়দের দৃষ্টিতে বেদ অপৌরুষেয় এবং পরম ব্রহ্মের নিঃশ্বসিত। কোন পুরুষের রচনা নয় বলে এবং গুরু-শিষ্য-পরম্পরায় দীর্ঘকাল শ্রুতিতে রক্ষিত বলে বেদের প্রকৃত কাল নিরূপণ দুষ্কর। সুতরাং মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিদের দ্বারা ঋক্‌মন্ত্র কবে দৃষ্ট হয়েছিল, তার কতকাল পরেই বা তা লিপিবদ্ধ হয়েছিল তা নির্ণয় করা অসম্ভব। বেদ অপৌরুষের নয় এরূপ ধারণার বশবর্তী হয়ে পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরাই সর্বপ্রথম বেদের কালনির্ণয়ে প্রবৃত্ত হন।

বিভিন্ন পণ্ডিতের মত 

এবিষয়ে পথিকৃৎ হলেন অধ্যাপক ম্যাক্সমূলার। তিনি মনে করেন যে, ভারতভূমিতে বৌদ্ধধর্মের আবির্ভাবের পূর্বেই বেদের সংহিতা ও ব্রাহ্মণ অংশ পূর্ণ রূপ পরিগ্রহ করেছিল। খ্রীঃ পূঃ ৫০০ অব্দে বৌদ্ধধর্ম ভারতে বিস্তারলাভ করে। সুতরাং তার দু’শ বা তিনশ বছর পূর্বে ব্রাহ্মণ অংশ সংকলিত হয় এবং তারও প্রায় দু’শ বছর পূর্বে সংহিতা ভাগের সংকলন সমাপ্ত হয়। তাই ম্যাক্সমুলারের মতে ৮০০-৬০০ খ্রীঃ পূঃ ব্রাহ্মণসাহিত্যের এবং ১০০০-৮০০ খ্রীঃ পূঃ সময়কালই হল বৈদিক সংহিতার সংকলন কাল। এটি সম্ভবতঃ বৈদিকসাহিত্যের শেষ স্তরের রচনাকাল। 

তবে পৃথিবীতে এমন কোন শক্তি নেই যা বৈদিক সূক্তসমূহের সঠিক রচনাকাল নির্ণয় করতে পারে। তাই ম্যাক্সমুলার মন্তব্য করেছেন- “Whether the Vedic hymns were composed 1000 от 1500 от 2000, 3000 years B. C., no power on earth will ever determine” (Gifford Lectures on Physical Religion, 1889). 

লোকমান্য বালগঙ্গাধর তিলক জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যের উপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, খ্রীঃ পূঃ ৪৫০০ থেকে খ্রীঃ পূঃ ২৫০০ অব্দের মধ্যে বেদের সংহিতা ও ব্রাহ্মণভাগ সংকলিত হয়েছিল। 

জার্মান অধ্যাপক এইচ জ্যাকোবি বেদে উল্লিখিত বিভিন্ন গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের বিচার করে আনুমানিক ৪৫০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দকে বৈদিক সংহিতার সংকলন কালরূপে চিহ্নিত করেছেন। 

ম্যাকডোনালের মতে খ্রীঃ পূঃ ১৩০০ বা ১৫০০ অব্দ হল ঋগ্বেদের রচনাকাল।

জার্মান পণ্ডিত ভিস্তারনিৎস উপরিউক্ত কোন মতকে সমর্থন করেন নি। তিনি ভাষাতত্ত্ব ও ঐতিহাসিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে স্বতন্ত্রভাবে বেদের কাল নির্ণয়ে প্রয়াসী হয়েছেন। তিনি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত করেছেন যে, খ্রীঃ পূঃ ২০০০ বা ২৫০০ বৎসর পূর্বে বেদ প্রথম রচিত হয় এবং খ্রীঃ পূঃ ৭৫০-৫০০ অব্দে বৈদিকসাহিত্য তার পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে। 

আবার ঐতিহাসিকদের মতে ভারতবর্ষের সিন্ধুসভ্যতা বৈদিকসভ্যতা অপেক্ষা প্রাচীন। খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দকে সিন্ধুসভ্যতার আবির্ভাবকাল রূপে চিহ্নিত করা হয়। এদিক থেকে বিচার করলে খ্রীষ্টজন্মের ২৫০০-২০০০ বৎসর পূর্বকে বা তার সমসাময়িক কালকে বৈদিক সভ্যতার আবির্ভাব কাল বলা যেতে পারে।

বক্তব্য

বিভিন্ন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পণ্ডিত বৈদিক সাহিত্যের রচনাকাল নির্ণয়ে নানাভাবে প্রয়াসী হয়েছেন। কিন্তু সর্বসম্মত কোন সিদ্ধান্তে তাঁরা উপনীত হতে পারেন নি। বৈদিক সাহিত্যের ব্যাপ্তি ও বিশালতা শুধু নয়, এর বৈচিত্র্যও সকলের বিস্ময় উদ্রেক করে। সুদূর অতীতের কোন রহস্যময় নিভৃতে এই সাহিত্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল তা আজও রহস্যাবৃত। অনাগত ভবিষ্যতে হয়তো নতুন গবেষণালব্ধ তথ্য এই বিস্ময়বিমুগ্ধ রহস্যের আবরণ উন্মোচন করতে পারবে।


Similar Posts

  • |

    গৌণ সংস্কৃত গদ্যকাব্য

    গৌণ সংস্কৃত গদ্যকাব্য : দণ্ডী, সুবন্ধু ও বাণভট্ট – এই তিন শ্রেষ্ঠ কবির আলোচনা করা হয়েছে। এঁরা ছাড়াও অনেকেই গদ্যকাব্য লিখেছেন, কিন্তু কাব্যগুণে সেগুলি নিতান্তই অপরিচিত। এই লেখায় সেগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় বিধৃত হলো। গৌণ সংস্কৃত গদ্যকাব্য শ্বেতাম্বর জৈন ধনপালের ‘তিলকমঞ্জরী’ অপর একটি গদ্যকাব্য। ধারাধিপতি বাষ্পতিরাজের পৃষ্ঠপোষকতায় খ্রীষ্টীয় দশম শতকের শেষদিকে কবি এই কাব্য রচনা করেন।…

  • |

    কবি বাণভট্ট, সংস্কৃত সাহিত্যের কবি

    কবি বাণভট্ট : সংস্কৃত গদ্যকাব্য-এর সর্বশ্রেষ্ট কবি ইনি। হর্ষচরিত এবং কাদম্বরী লিখেছেন তিনি। কাদম্বরী তাঁর ‘কথা’ শ্রেণির কাব্য। কবি বাণভট্ট, সংস্কৃত সাহিত্যের কবি কবি বাণভট্টের পরিচয় সংস্কৃত গদ্যকাব্যের জগতে বাণভট্ট কবিসার্বভৌম। আলংকারিকদের মতে গদ্যরচনাই হল কবিলেখনীর নিকষিত হেম— “গদ্যং কবীনাং নিকষং বদন্তি।” বাণভট্ট গদ্যরচনার পরীক্ষায় অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘হর্ষচরিত’-এর প্রথম আড়াই উচ্ছ্বাসে বাণ তাঁর…

  • |

    বৈদিক সাহিত্যের সাধারণ পরিচিতি

    বৈদিক সাহিত্যের সাধারণ পরিচিতি : বৈদিক সাহিত্যের সাধারণ পরিচিতি অর্থাৎ বৈদিক সাহিত্য বলতে প্রকৃতপক্ষে কী বোঝায় এবং এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের সংক্ষিপ্ত ধারণা। বৈদিক সাহিত্যের সাধারণ পরিচিতি সুদূর অতীতে আর্যদের সভ্যতা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ভারত ভূমিতে স্বয়ং উদ্ভূত হয়েছিল এক পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য যার মধ্যে বিধৃত আছে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ। পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যদেশ…

  • |

    কবি দণ্ডী, দশকুমারচরিত রচয়িতা

    কবি দণ্ডী : সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাসে গদ্যকাব্য রচয়িতা হিসেবে দণ্ডী উল্লেখযোগ্য একজন কবি। তাঁর সময়কাল ও কাব্য পরিচয় এখানে বিধৃত হলো। কবি দণ্ডী, দশকুমারচরিত রচয়িতা কবি দণ্ডীর সময়কাল কাব্যলক্ষণাক্রান্ত সংস্কৃত গদ্যকাব্যের ইতিহাসে দণ্ডী, সুবন্ধু এবং বাণভট্টই অবিস্মরণীয় কীর্তির অধিকারী। দণ্ডীর ‘দশকুমারচরিত’ একটি বিশিষ্ট গদ্যকাব্য। খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভের সামান্য পূর্ববর্তী সময়কে দণ্ডীর আবির্ভাব কাল বলে…

  • |

    চরকসংহিতা

    চরকসংহিতা : আয়ুর্বেদশাস্ত্র বা চিকিৎসাশাস্ত্র হিসাবে সংস্কৃত ভাষায় রচিত চরকসংহিতা অন্যতম ও প্রাচীনতম গ্রন্থ। এই গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত আলোচনা দেওয়া হলো। চরকসংহিতা সূচনা বর্তমানে যে আকারে ‘চরকসংহিতা’ গ্রন্থটি পাওয়া যায় তার প্রকৃত রচয়িতা হলেন মহর্ষি আত্রেয়ের অন্যতম শিষ্য অগ্নিবেশ। অথর্ববেদের পর থেকে উপনিষদ যুগের শেষ পর্যন্ত ‘অগ্নিবেশতন্ত্র’-ই আয়ুর্বেদশাস্ত্র শিক্ষার প্রধান গ্রন্থ ছিল। কালের করাল গ্রাসে এবং…

  • |

    আর্য মহাকাব্যের ভূমিকা

    আর্য মহাকাব্যের ভূমিকা : আর্য মহাকাব্য বলতে সংস্কৃত ভাষায় রচিত রামায়ণ ও মহাভারত কাব্যদ্বয়কে বোঝায়। আর্য মহাকাব্যের ভূমিকা বৈদিক সাহিত্য ও লৌকিক সাহিত্যের মধ্যবর্তী যুগে ভারতবর্ষে দুই বৃহদায়তন মহাকাব্যের আবির্ভাব ঘটে। এই মহাকাব্য দুটি হল-রামায়ণ এবং মহাভারত। কেবল আয়তনে নয়, বিষয় বৈচিত্র্যেও এই মহাকাব্যদ্বয় সমৃদ্ধ। রামায়ণের রচয়িতা বাল্মীকি, মহাভারতের রচয়িতা মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস। ঋষি কবিদ্বয়…